Monday, October 14, 2019

তখন সিঁড়িতে নামতে বাধ্য হতে হয়
সান্থালি ভাষার প্রথম বই হল সংগীতের। আমেরিকা ব্যাপটিস্ট মিশনের রেভারেণ্ড ফিলিপ জলেশ্বর অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রচলিত লাগড়ে গান, পাতা গান, উপকথা সংগ্রহ করেন এবং সেগুলি একস্থানে জড়ো করে এই বইটি বের হয়। সম্ভবত এটি বাংলা লিপিতে বের হয়েছিল। ঘটনাটি ১৮৪৫ এর, এবং সত্যি বলতে কী, এর আগে তাদের জীবনে প্রথাগত লেখা-পড়ার ব্যাপারটি না থাকায় এবং সম্পূর্ণ অন্য এক ডাইমেনশনে তাদের জীবন চলতে থাকায় সুপ্রাচীন গল্প কবিতা, গান, বিনতী কোনোটাই অক্ষরমালায় গেঁথে রাখার প্রয়োজন হয়নি। হতও না। তারা ভাবত না সবেরই কোথাও না কোথাও একটা শেষ থাকে, কিছু কিছু জিনিস ক্ষয়ে যায়
শেষের প্রথম পর্ব
খিষ্ট্রধর্ম প্রচারের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে হোক বা করুণা পরবশ হয়ে হোক, মোট কথা মিশনারিরা সেই গান-কবিতাকে সংরক্ষণ করার কথা ভেবে বসে এবং রোমান হরফে সান্থালি ভাষাকে ছাপযোগ্য করে তোলে। ১৮৬৩ তে ডাঃ লেপসাস সেটিকে আরেকটু সংশোধন করলে দুমকার বেনাগাড়িয়া থেকে পর পর সান্থালি বই-পত্রিকা ছাপা হতে থাকল। ততদিনে মিশনারি আবহাওয়াতে থেকে বিরাম হাঁসদা্, ডোডেম হাঁসদা, খুদিয়া মারাণ্ডি, বাবুরাম বেঞ্জামিন সরেন সহ অনেকে উঠে এসেছেন। পাল্লা দিয়ে সাহেবরাও ইংরেজিতে পর পর সান্থালি সংস্কৃতি বিষয়ক বই লিখে যাচ্ছেন। আদিবাসী চিন্তায়-চেতনায় অজান্তেই ঢুকে পড়ছে যীশুর রক্ত
শেষের দ্বিতীয় পর্ব
বিশ শতকের শুরুর দিক। ছোটোনাগপুর মালভুমির সর্বত্র রেল এবং সড়কপথ চালু হতেই অরণ্যচারীরা শিক্ষিত মূলধারার সান্নিধ্যে এল। অপর্যাপ্ত মিশনারি স্কুল এবং শিক্ষা-চাহিদা অবধারিত ভাবে তাদের ঠেলে দিল কাছাকাছির বাংলা, হিন্দি কিম্বা ওড়িয়া মাধ্যমে। শিশুর ---, চেনা, জানা, কোনোটাই মাতৃভাষায় রইল না। সেসময় যারা নিরক্ষর ছিলেন তারা বরং নিখাদ ছিলেন
কেউ কেউ কিছু বুঝতে পারেন
সংকট বুঝেছিলেন শিলদার সাধু রামচাঁদ মুর্মু এবং ময়ুরভঞ্জের রঘুনাথ মুর্মু। তাঁরা সান্থালি শোনিতে তৈরি করেনমজ দাদের আঁকএবংঅলচিকি’- এই লিপি দুটি। এর মধ্যে অলচিকিই ধীরে ধীরে পরিচিতি পায়। কিন্তু স্বাধীন ভারতে দেখা যায়, তারা বাংলা, ওড়িয়া, দেবনাগরী, রোমান, অলচিকি - পাঁচরকম লিপির বোঝা বহন করছে। সভ্যতার গায়ে গায়ে থেকে যে লিপি সাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী, যে লিপি ভীষন পুরুষতান্ত্রিক, অহঙ্কারি, রাজনৈতিক, সুযোগসন্ধানী- সেই লিপিগুলির ভার বহন করা তাদের কাছে কত বড় বোঝা ছিল হয়তো কোনোদিন বুঝতেই পারবনা। নেহেরু জমানার দ্বিতীয় ধাপ থেকে সর্বত্র স্কুলশিক্ষা চালু হতে তাদেরকে আমাদের মতো করে নেওয়ার একটা ল্যাবরেটরি এক্সপেরিমেণ্ট চালু হল। বিক্রিয়ায় অনুঘটক আমাদের ভাষা আর লিপি
কেউ কেউ প্রতিবাদী থাকেন
তারা রঘুনাথ মুর্মুর তৈরি অলচিকিতে পঠনপাঠনের দাবি জোরালো করল। অন্যত্র না হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার অবশেষে মেনে নেয় ১৯৭৯ তে। কিন্তু সরকারি স্বীকৃ্তি নয়, কোট আনকোট নীতিগত ভাবে। চাপে পড়ে। অলচিকিপন্থীদের ক্ষোভ প্রশমিত হলনা। এদিকে যারা ইতিমধ্যেই বাংলা কিম্বা অন্য কোনো লিপিতে লেখাপড়া শিখে এসেছেন তারাও অলচিকিকে সমর্থন করতে গিয়ে বেঁকে বসলেন
কেউ কেউ কিছুই পায়না

কখনো কখনো একটি গোটা জাতিই কিছু পায়না। এরাও পায়নি। এত সমৃদ্ধ মৌখিক সাহিত্যভাণ্ডারকে নাড়াচাড়া করার কোনো লিপি পেলনা। লিপি না পাওয়াতে ভাষাগত ভারসাম্য এবং সংস্কৃতি নষ্ট হল। শেখার মাধ্যমটি অন্য হওয়াতে সংস্কৃতিতে দ্রুত অনুপ্রবেশ হচ্ছে। আমরা জেনে বা না জেনে হই হই করে ঢুকে যাচ্ছি সেখানে। ঈশ্বর সাকার হতে চাইছে। অলচিকি এসেছে বটে, লড়ায়ের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। অবহেলা নিত্যসঙ্গী। অধিকারের লড়াই আর কত দীর্ঘ হবে?

BIPLAB DAS
06/03/2019

Monday, September 16, 2019

‘ওয়ার্ল্ড কার ফ্রি ডে’( WORLD CAR FREE DAY )

https://www.facebook.com/photo.php?fbid=2553689734651413&set=a.104403046246773&type=3&theater
‘ওয়ার্ল্ড কার ফ্রি ডে’( WORLD CAR FREE DAY ) আগামী ২২ সেপ্টেম্বর, রবিবার।
বেশ কয়েকটি দেশের বেশ কয়েকটি শহরে চলবেনা বাস, ট্যাক্সি, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরবাইক। বছর পঞ্চাশেক আগে খনিজ তেলের সঙ্কটের সময় কোথাও কোথাও এরকম দিন পালনের প্রতীকী প্রয়োজন পড়েছিল। সময় পাল্টেছে। এখন পরিবেশের কথা মাথায় রেখে দিনটি পালিত হয়। কলম্বিয়ার বোগোতার মত বেশ কিছু শহরে বছরে একবার মাত্র ‘কার ফ্রি ডে’ নয়, সপ্তাহে বা মাসে এক দিন করে গাড়ি চালানো হয়না। সবাই যায় হেঁটে বা সাইকেলে।
৩৬৫ দিনে ১ দিন দূষণ কমলে কী আর হবে?
মানছি আপনার কথা। এতে হয়ত ১ শতাংশও দূষণ কমবে না। কিন্তু মাত্র ৫ শতাংশ ডি এ বাড়লেও তো আনন্দের শেষ থাকেনা। তাই ২২ সেপ্টেম্বর ‘কার ফ্রি ডে’ পালন করি চলুন।
এটা একটু বেশিই আঁতলামি হয়ে যাচ্ছে না কি? গাড়ি থাকতে সাইকেল চড়ব, পায়ে হাঁটব?
রোজ সন্ধ্যেয় হুইস্কি ভদকা গিলেও তো পুরুলিয়াতে মহুয়া খেতে যাই। তাই ‘একটা কার ফ্রি ডে’।
আমি একা এটা করলে দূষণ বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে কি?
না, হবে না। এই বিশাল পৃথিবীতে আমি-আপনি নগণ্য। আমাদের কেউ হিসেবের মধ্যে ধরেই না। তাই তো আমার-আপনার গ্ল্যামারও নগণ্য। আসুন একদিন গ্ল্যামার ছাড়ি, প্রয়োজন ছাড়ি। সবাইকে বুক বাজিয়ে শেয়ার করে জানিয়ে দিন ‘কার ফ্রি ডে’।
যে কাজগুলো গাড়ির জন্য করলাম না। সেগুলো তো পরের দিন করতে হবে। কাজটির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ধোঁয়া সেইই তো বেরোলো। লাভ কিছু হল কি?
কখনও হিসেব কষে দেখেছি, সারাদিনে আমরা অ-কাজে কতটা ধোঁয়া বের করি? কিছু অকাজের ধোঁয়া তো বেরোলো না। তাই তো হ্যাপি ‘কার ফ্রি ডে’।
‘কার ফ্রি ডে’ পুঁজিবাদী অর্থনীতির ক্রাইসিস থেকে উঠে আসা একটি আইডিয়া। ক্রাইসিস মোকাবিলায় তারা এটাকে হুজুগে পরিনত করতে চাইছে।
ঠিকই ধরেছেন। তবে এটা মানেন তো ক্রাইসিস থেকে উঠে আসা ঈশ্বরেরা আজ হুজুগ। এজন্যই তো বলছি, করুন না একটামাত্র ‘কার ফ্রি ডে’।
সেদিনে কী করবে পরিবহনের সাথে বিভিন্ন ভাবে যুক্ত ‘দিন আনি দিন খাই’ শ্রমিকেরা?
শ্রমিকটি কোনো দিন প্রাণ ভরে শ্বাস পেয়েছে কিনা জেনেছি? শুধিয়েছি কখনও, সে একদিন উপোষের বিনিময়ে শ্বাসবায়ু চাইছে নাকি? তাকে চুপি চুপি ডেকেছি পায়ে হাঁটার মিছিলে? তাকে বলেই দেখুননা ‘কার ফ্রি ডে’র গল্প।
গাড়ি না হয় চলল না। কিন্তু কারখানা? থার্মাল পাওয়ার প্ল্যাণ্ট? রান্নার উনুন?
ক্লাসে সবাই ফার্স্ট হয়? সেকেণ্ড, থার্ড, ফোর্থ...এরাও থাকে তো। তাইতো একটা দিন শুধুমাত্র আমার-আপনার গাড়ি বন্ধ। ‘কার ফ্রি ডে’।
মা দিবস, বাবা দিবস, পরিবার দিবস, ভালবাসা দিবস- হাঁফিয়ে উঠছি। আর কত দিবস পালন করব?
খাতা, পেন , ক্যালকুলেটর নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় হিসেবে বসুন। দেখুন, একটাই দিবস পালন করতে ইচ্ছে করবে - 'কার ফ্রি ডে'।
ভারতের মত গরিব দেশে আশি ভাগ লোকের কোনোরকম মোটরচালিত যান নেই। গাড়ি চাপা তাদের কাছে বিলাসিতা।তারা তো দূষণ ঘটায়নি। এখানে এসব হুজুগের দরকার আছে?
হ্যাঁ, আছে বৈকি। একদিন তাদের মত হেঁটে তাদের স্যালুট করার সুযোগ হারাবেন কেন? তাই তো বলছি, ২২ সেপ্টেম্বর ‘কার ফ্রি ডে’।
সেদিন আমি তো হাঁটছি, আপনি?
Biplab Das 14-09-2019
Photo courtesy: google.com

Wednesday, September 4, 2019

SUNDAY

S  U  N
D  A  Y
রবিবার হলেই হইহই করে সবাই রাজপথে নেমে পড়ে। চলে নাচগান, চলে মুকাভিনয়-নাটক-যোগব্যায়াম-জিমন্যাস্টিক। যতক্ষণ এসব চলে, সকাল সাতটা থেকে দুপুর দুটো- শহরের ১২০ কিলোমিটার রাজপথে একটিও মোটরগাড়ি চলে না। যারা হাঁটেন তারা তোঁ হাঁটবেনই। বাকিরা সাইকেলে চেপে ঘুরে বেড়ান। রাজপথের মসৃন বুকে বালক-বালিকারা কেউ কেউ স্কেট করতে করতে যায়।

‘সাইক্লোভ’। ১৯৭৪ সাল থেকে কলম্বিয়ার বোগোতা শহরের প্রতিটি রবিবার এভাবেই কেটে আসছে। প্রচলিত ব্যবস্থাকে তোয়াক্কা না করে একটু অন্যরকম, শুধুমাত্র একটু অন্যভাবে বাঁচতে এবং দূষণহীন কিছুটা সময় কাটানোর জন্য শহরের সাইকেলপ্রেমী যুবকেরা যে পরবের সূত্রপাত করেছিলেন সময়ের সাথে সাথে সেই পরবের ব্যাপ্তি বেড়েছে। মাত্র দু বছরের মাথায়, ১৯৭৬ সালেই এই উৎসবে সরকারি সিলমোহর পড়ে। শহরের বিশাল সংখ্যক জনগণ এতে সামিল হতে থাকেন। শহরবাসীরা সাইক্লোভকে এতটাই ভালোবেসে ফেলেছেন যে, ২০০৭ এ হঠাৎই কিছু কিছু রাজনৈতিক নেতা সাইক্লোভ নিষিদ্ধ করে দেওয়া জন্য আইন আনতে চাইলে গণচাপে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। এখন তো শুধুমাত্র রবিবার নয়, অন্যান্য পাবলিক ছুটির দিনেও বোগোতার ওই সব রাস্তায় ধোঁয়াচালিত যান বন্ধ করে দেওয়া হয়। সকাল হলেই রাস্তায় নেমে পড়েন শহরের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ, সংখ্যায় প্রায় কুড়ি লাখ।

কলম্বিয়ার দেখাদেখি অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্ট-মেলবোর্ণ, আর্জেণ্টিনার রোজারিও, বেলজিয়ামের ব্রাসেলস, কানাডার উইনিপেগ-ভ্যাঙ্কুভার-হ্যামিলটন-ওটাওয়া-টরেণ্টোতে ‘সাইক্লোভ’ শুরু করা হয়েছিল। কোথাও এখনো চলে, কোথাও পারা যায়নি।

পরীক্ষানিরীক্ষার শেষ নেই। ব্রাজিলে বড় কয়েকটি শহরে রবিবার কয়েকটি রাস্তা শুধুমাত্র পদযাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। চিলির সাণ্টিয়াগোতে প্রতি রবিবার সকালে ৩২ কিলোমিটার রাস্তা মোটরগাড়ি নিষিদ্ধ। বোগোতার মতই সেখানে সাইকেল, স্কেটিং নিয়ে মানুষ রস্তায় নেমে পড়েন।
কোস্টারিকা, গুয়াতেমালা, মেক্সিকো, পেরু, নিউজিল্যাণ্ড, ইকুয়েডর, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের মানুষ বোগোতার ‘সাইক্লোভ’ মডেল চালু করেছে। জনচাপ প্রশাসনকে নড়াতে পারে- সাইক্লোভ এর উদাহরণ।

ভারতে? হ্যাঁ। ‘রাহগিরি’ নাম দিয়ে গুরগাঁওতে ২০১৩ সালে একটিবার চেষ্টা করা হয়েছিল।

শুধুমাত্র দূষন থেকে বাঁচতে? নাকি ভোগবাদী সমাজ নিজের সংকট থেকে বেরোতে উপায় বের করার চেষ্টা করছে? নিরন্তর মারকাটারি লেগে থাকা অস্থির কলম্বিয়াবাসীরা এরকম আপদে নিয়মকে আপন করে মেনে নিলেন কেন?       

photo courtsey: google.com

আমাজন-আমেরিকা- চিন কঙ্গো

পৃথিবীর দুটি ফুসফুস। বাম ফুসফুসটি দক্ষিণ আমেরিকায়, আমাজনের জঙ্গল। ডানটি আফ্রিকার কঙ্গোতে। ব্রাজিলের প্রেসিডেণ্ট ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে, আমাজনকে খনিমালিকদের জন্য  উন্মুক্ত করে দেওয়া হল। আরও ঘোষণা, সেখানে জঙ্গল কেটে চাষবাস করতেও কোনো বিধি নিষেধ রইল না। যেই না বলা, মার্কিন শিল্পগোষ্ঠীদের নজর চলে গেল উর্বর আমাজনের দিকে।
ওদিকে কঙ্গোর রেইন ফরেস্ট থেকে লক্ষ লক্ষ চিরহরিৎ বৃক্ষ কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে চিনে। চিন আমেরিকার জন্য সস্তার আসবাবপত্র বানিয়ে দেয়। তার প্রায় পুরোটাই এখন কঙ্গোর অরণ্য থেকে সরবরাহ হয়।
শক্তিধর দেশগুলির নজর আফ্রিকায়। অসাম্য-দূর্নীতি-গহযুদ্ধ-অস্থিরতা লেগে থাকা দেশগুলির দিকে। যেখানে পরিবেশ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ খুবই কম, থাকলেও সেখানে কিছু খুচরো পয়সা ছড়ালেই সবাইকে কেনা যায়। সরাসরি ব্যবসায় অসুবিধে হলে যে কোনো একটি স্থানীয় সংস্থা কে শিখণ্ডি রূপে দাঁড় করিয়ে দিলেই হল।
শেষ কয়েক বছরে কঙ্গো থেকে চিনে যাওয়া কাঠের পরিমান প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। চিন নিয়ে যাচ্ছে একেবারে গোল গোল কাঠের লগ। গাছ কাটা হচ্ছে মেশিনে। কাঠ কাটা, চেরাই কোনোটাই কঙ্গোতে হচ্ছে না। চিনের কাঠ ব্যবসায়  কঙ্গোর স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবুও স্থানীয় জোরদার প্রতিবাদ নেই। কেন?
উত্তর পাবেন এখানে। ছত্তিশগড়ে পারসায়, ঝাড়খণ্ডে পশ্চিম সিংভুমে, পুরুলিয়ার অযোধ্যায়। কোন কৌশলে জল-জঙ্গল-জমিকে  বৃহৎ পুঁজির হাতে তুলে দেওয়া যায় তার রোল মডেল ভারত, নেহেরুর আমল থেকেই।

Biplab Das 20-04-19
Photo courtesy:  google.com

এক দুপুর খিদে

মহিলা হাত বাড়িয়ে দেখালো,  লম্বা,  সরু,  এক-মোচড় দেওয়া লেড়ো বিস্কুটের দিকে। দোকানি একবার প্লাটফর্মে বসে থাকা লোকটি আরেকবার মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে তিনটে বিস্কুট বের করল। মহিলার কোলে একটা ধেড়ে বাচ্চা। সে দুমড়ে মুচড়ে শরীরটাকে স্থির করতে চেষ্টা করছে,  লেড়ো বিস্কুটের মতো।

মহিলার পায়ের কাছে প্লাটফর্মে বসে থাকা লোকটির কোনো নেশা নেই,  দাঁত দেখেই বোঝা যায়,  ঝকঝকে,  দাঁতে করে কামড়ে মুখ ভর্তি লেড়োর পেষ্ট বানিয়ে অনেকক্ষণ ধরে তারিয়ে তারিয়ে এ গাল আর ও গাল করছে। ছেলেটিকে কোল থেকে নামাতেই বোঝা যায়,  স্পেশাল চাইল্ড। প্রথমেই শুয়ে পড়েছে নোংরা প্লাটফর্মে। তারপর নখ দিয়ে আঁচড় কেটে কেটে কী যেন আঁকতে যায়।  বাঁ হাতের বিস্কুটটা মুখে পুরতে পারছে না। মা বোঝে।

মা বোঝে এক দুপুর খিদে নিয়ে বাচ্চার কী হয়। নিজের বিস্কুট মুখে চালান করে বাচ্চাকে তার বিস্কুটটি একটু করে ভেঙ্গে ভেঙ্গে দেয়। মহিলার হাত যখন কাজ করে,  চোখ তখন ব্যস্ত উল্টো দিকের প্লাটফর্মে, হলুদ রঙের খোঁজে। হঠাৎ, এক অদ্ভুত গোঙানি শুনে সচকিত মহিলা দোকানির দিকে তাকিয়ে বলে, "একটু চা দিবেন?"

চা দিতে গিয়ে দোকানি বোঝে লোকটি অন্ধ। স্মৃতিতে স্বাদ আছে, রঙ নেই। ওদিকে ধেড়েটি ফের কোলে উঠে মায়ের  ব্লাউজের হুক ধরে টানাটানি শুরু করেছে। মহিলার একটা হাত ছেলেকে আটকাতে ব্যস্ত, মহিলার শরীর ধরে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছে অন্ধ ব্যক্তি,  মহিলার চোখে ট্রেন মিস করার আশঙ্কা, এসময়ে দোকানি বলে উঠলো, “ তিন দুয়ে ছয় আর চার মিলে দশ টাকা। “

পয়সা?  সে তো সারের বস্তা কাটা থলির ভিতরে।  ওদিকে একটা ট্রেন ঢুকছে।  গেটের কাছে বাবুটি বলে দিয়েছিল  একটু পরেই ওদিকে দিয়ে আসবে হলুদ ট্রেন।  এটা হলুদ তো?  সে অন্ধ নয়,  তাই রক্ষে।

একটা থালা-বাটি ,  দুটো ন্যাকড়া,  ছোটো গামছা একটি,  একটা দাঁতন,  দুটো প্রেসক্রিপশন,  একটি শিশি,  ওষুধের পাতা বেরোনোর পর বেরোলো একটি প্যারাশুট নারকেল তেলের বড়ো মুখওয়ালা কৌটো। সেখান থেকে দশ টাকার নোট বের করে ফের সবগুলো থলিতে ঢোকাতে ঢোকাতে ছেলেটি ওর ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে বাম স্তনটি বের করে ফেলেছে। পিছনে পিঠ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকটি। একটি উন্মুক্ত স্তন নিয়ে দোকানির টাকা চুকিয়ে থলি হাতে মহিলা জোর পায়ে হাঁটতে থাকে হলুদ রঙের ট্রেনের দিকে। কোলে ছেলে,  পিঠে হাত দিয়ে তাকে ছুঁয়ে ছুটছে লোকটি, তার বর নিশ্চয়। মুক্ত স্তন, একদম শুকনো, ভারহীন, পাখির পালকের মতো।

স্তন জোরে জোরে নড়ছে,  ট্রেনটিও একটু নড়ে উঠলো যেন।  স্তন মুখে পোরার সুযোগ পাচ্ছে না,  বাচ্চাটির গলা ফাটা চিৎকার ট্রেনের হুইশলকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে। এখনও অনেকটা বাকি। তিনজন তিনজনকে স্পর্শ করে ছুটছে একটা বৃহৎ শরীরের মতো। যে শরীরে তিনটে মুখ, তিনটে পেট, তিনটে পায়ু, ছটা পা,  দুটো চোখ,  একটা মাথা, দুটো হাত......

Biplab Das
18-06-19